
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার হাজীনগর ইউনিয়নের মাকলাহাট গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মো. মাহফুজ আলম। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অসময়ের তরমুজ চাষ করে ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন তিনি।
পড়াশোনা শেষ করে প্রচলিত চাকরির চিন্তা বাদ দিয়ে প্রায় তিন বছর আগে নিজের জমিতে কৃষিকাজ শুরু করেন মাহফুজ। প্রথমদিকে তরমুজ, পেঁয়াজ ও মিষ্টি কুমড়া চাষ করলেও তরমুজে প্রত্যাশিত লাভ পাননি। তবে ব্যর্থতায় থেমে না গিয়ে নতুন পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আবারও তরমুজ চাষে মনোনিবেশ করেন তিনি।
চলতি মৌসুমে তিনি ১৪ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ১২ বিঘায় বেগুন এবং ২ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এরই মধ্যে বেগুন চাষে সফলতা পেয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় ৬ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ ও শসা চাষ করেও লাভবান হয়েছেন।
মাচায় ঝুলছে শত শত তরমুজ
সরেজমিনে মাকলাহাটের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ লতা-পাতায় ছেয়ে আছে বিস্তীর্ণ জমি। বাঁশ ও জালের তৈরি মাচায় সারি সারি ঝুলছে গাঢ় সবুজ রঙের তরমুজ। পোকামাকড়ের আক্রমণ ও বৈরী আবহাওয়া থেকে ফল রক্ষায় প্রতিটি তরমুজ নেটের ব্যাগে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা ও আগাছা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক মালচিং পেপার প্রযুক্তি।
প্রচলিত মৌসুমি চাষের বাইরে গিয়ে অসময়ে মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের এই উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও উৎসুক মানুষ মাকলাহাটে আসছেন।
একজনের সাফল্যে আগ্রহী অন্য তরুণরাও
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মাকলাহাট এলাকায় বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি প্রায় ১০১ বিঘা জমিতে বেগুন, ৮ বিঘায় তরমুজ এবং ৩ বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে ফিরোজ আলম, নাসিম, শামীম, আইনুল ইসলাম, শহিদুল, শামীম ও ফারুকসহ অনেকে কৃষিতে যুক্ত হয়েছেন।
মাহফুজ আলমের মতো তরুণদের উদ্যোগে এলাকায় কৃষি এখন শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক বেকার যুবকও কৃষির দিকে ঝুঁকছেন।
লাভের আশায় মাহফুজ
তরুণ উদ্যোক্তা মাহফুজ আলম বলেন, “চিরাচরিত ধান কিংবা আলু চাষের তুলনায় কম সময়ে ভালো কিছু করার চিন্তা থেকেই তরমুজ চাষে আগ্রহী হই। সঠিক সময়ে পরিচর্যা করায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। বর্তমানে বাজারে অসময়ের তরমুজের চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো। সব খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো মুনাফা পাওয়ার আশা করছি।”
তরুণদের কৃষিতে আগ্রহ ইতিবাচক
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত নিয়ামতপুরের মাকলাহাটের মাটি ও আবহাওয়া উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফসল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। আধুনিক মালচিং ও মাচা পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ফলন বাড়ার পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলকভাবে কম হয়।
কৃষিতে তরুণদের এমন উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে নিয়ামতপুরে অসময়ের তরমুজসহ উচ্চমূল্যের ফসল চাষ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাহফুজের মাচায় ঝুলছে শুধু তরমুজ নয়—ঝুলছে একজন তরুণের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নই হয়তো আগামী দিনে নিয়ামতপুরের আরও অনেক তরুণকে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথ দেখাবে।