
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নওগাঁর নিয়ামতপুরে দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমন ধানের জমিতে দেখা দিয়েছে মাটির ফাটল। তীব্র রোদ ও অনাবৃষ্টিতে অনেক ক্ষেতের মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও ধানগাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে নুয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। ফসল বাঁচাতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে সেচ দিতে হচ্ছে তাঁদের, পাশাপাশি সার কেনার খরচ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিয়ামতপুরের আটটি ইউনিয়নেই চলতি মৌসুমে ব্যাপক পরিসরে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। তবে চারা রোপণের পর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক কৃষক সেচপাম্প ও শ্যালোমেশিনের সাহায্যে জমিতে পানি দিচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক চাপে পড়ছেন তাঁরা।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি ঘুরে দেখা গেছে, পানির অভাবে অনেক আমনক্ষেতের মাটি শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। তীব্র রোদে ধানগাছের পাতা নুয়ে পড়ছে, কিছু গাছের রংও বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। যেসব কৃষকের বাড়তি অর্থ ব্যয় করে সেচ দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা বিকল্প ব্যবস্থায় ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠেছে। সময়মতো বৃষ্টি না হলে তাঁদের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলার পিরপুর গ্রামের কৃষক পলাশ আক্তার বলেন, “বারো বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছি। বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় সেচের খরচও বেড়েছে। বাড়তি এই ব্যয় কীভাবে সামাল দেব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
সাবইল গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল জানান, আমন ধানের চারা বেড়ে ওঠার এই সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত পানি ও আর্দ্রতা থাকা জরুরি। কিন্তু অনাবৃষ্টি ও তীব্র রোদের কারণে জমির পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। সেচ দিয়েও দীর্ঘ সময় মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সেচ খরচে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতি বিঘা জমিতে সেচের জন্য গড়ে প্রায় ৪০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হতে পারে। লিটারপ্রতি দাম ২০ টাকা বাড়ায় বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮০০ টাকা। এর সঙ্গে সার কেনার বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় আমন চাষ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দাম অপরিবর্তিত থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, প্রতি কেজি ইউরিয়া সারে ১০ থেকে ১১ টাকা, টিএসপি সারে ৬ টাকা এবং পটাশ সারে ৪ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে বিঘাপ্রতি সেচ ও সার বাবদ কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সার বিক্রেতা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নিয়ামতপুরে ৩১ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের দেওয়া হিসাব ও উল্লিখিত জমির পরিমাণের ভিত্তিতে সেচের বাড়তি ব্যয় নিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পুরো উপজেলায় অতিরিক্ত ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণে জমিভিত্তিক সেচের প্রয়োজন, ডিজেল ব্যবহারের হার ও প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধির তথ্য যাচাই করা জরুরি।
নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমন ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বর্তমানে বৃষ্টির পানি খুবই প্রয়োজন। বৃষ্টি না হওয়ায় যেসব জমিতে মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে, সেসব জমিতে কৃষকদের সম্পূরক সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ফসলের সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।”
সব মিলিয়ে অনাবৃষ্টির প্রভাব, সেচের বাড়তি ব্যয় ও সার কেনার খরচ—এই তিন চাপে নিয়ামতপুরের আমনচাষিরা কঠিন সময় পার করছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত হলে জমিতে স্বাভাবিক আর্দ্রতা ফিরে আসবে এবং ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা কমবে। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কাও বাড়তে পারে।