
বুধবার ৫আগষ্ট ২০২৬
দক্ষিণাঞ্চলের ‘দুঃখ’ বলে পরিচিত ভবদহ বিল এলাকা ও ২১ ভেন্ট স্লুইস গেট চত্বরে পা রাখতেই চোখে পড়ে এক করুণ দৃশ্য। একদিকে পলি জমে স্তব্ধ হতে বসা নদীর গতিপথ, অন্যদিকে কপাটের জং ধরা কাঠামো। বর্ষা মৌসুম এলেই অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুরের শত শত গ্রামের মানুষের চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নেয় জলাবদ্ধতা।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভবদহ স্লুইস গেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্লুইস গেটের পলি সরাতে সেনাবাহিনীর তদারকিতে ড্রেজিং চললেও স্থানীয়দের মনে স্থায়ী সমাধান নিয়ে এখনো রয়ে গেছে চরম সংশয়।
স্লুইস গেটের ওপর দাঁড়িয়ে কথা হয় ডুমুরিয়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ কৃষক অখিল দাসের সাথে। জীবনের বহু সময় ধরে এই অভিশপ্ত জলাবদ্ধতার সাথে লড়াই করে চলছেন তিনি।
প্রতিবেদক: অখিল কাকা, ভবদহ স্লুইস গেটের এখন যে অবস্থা দেখছেন, এতে কি আপনাদের দুর্ভোগ কিছুটা কমছে?
অখিল দাস: (গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে) “বাপু, গেটের কপাট দু-একটা খোলা থাকলেও পলি জমে নদীর তলা উঁচু হয়ে গেছে। উজুড়ে পানি নামবে কীভাবে? পাম্প দিয়ে পানি সেচে সাময়িক ধান চাষের চেষ্টা করা হয় বটে, কিন্তু এক পশলা ভারী বৃষ্টি হলেই বিলের পর বিল ভেসে যায়। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী মুক্তি চাই।”
প্রতিবেদক: পানি উন্নয়ন বোর্ড তো নদী খনন আর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প চালাচ্ছে। আপনাদের মূল দাবিটা আসলে কী?
অখিল দাস: “পানি বোর্ডের এই ঠিকাদারদের খননে আমাদের কিস্যু লাভ হয় না। পলি তো নদী কেটে ঠেকানো যাবে না! কুদরতি নিয়ম না মানলে ভবদহের মুক্তি নেই। একমাত্র উপায় হলো বিলে বিলে ‘টিআরএম’ (জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থাপনা) চালু করা। জোয়ারের সাথে পলি বিলে ঢুকুক, বিলে পলি জমে উঁচু হোক আর নদী নাব্য থাকুক। নদী বাঁচার রাস্তা না দিলে আমাদের পুরো অঞ্চল একদিন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।”
প্রতিবেদক: প্রশাসনের প্রতি আপনাদের বার্তা কী?
অখিল দাস: “আমরা একটাই কথা বলি—প্রকল্পের নামে টাকা নষ্ট না করে মানুষের কথা শুনুক। আন্দোলন করতে করতে আমাদের চুল পেকে গেল। কপাট আর গেট নয়, নদীকে নিজের পথে চলতে দেওয়া হোক। আমরা শান্তিতে বাস করতে চাই, নিজেদের জমিতে সোনার ফসল ফলাতে চাই।”
প্রতিবেদকের টীকা: দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে সাময়িক পাম্পিং বা অপরিকল্পিত খনন যথেষ্ট নয়। স্থানীয় কৃষিজীবী ও ভুক্তভোগীদের সাথে একাত্ম হয়ে বিজ্ঞদের মতামত—প্রাকৃতিক নদী ব্যবস্থাপনা (টিআরএম) নিশ্চিত না করলে ভবদহের অভিশাপ চিরতরে মোছা সম্ভব নয়।