গত ৪৮ ঘন্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের উপর ফ্রি স্টাইলে হামলা চালানো, মারধোর ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত করার মহোৎসব চলেছে। টেকনাফে হত্যার উদ্দেশ্যে যুগান্তরের ভ্রাম্যমাণ প্রতিবেদক আবুল কাশেমকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। এতে তিনি বাম হাতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়াও নড়াইল, ঝিকরগাছা, ফরিদপুরের মধুখালী, ঝিনাইদহের মহেশপুর, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, খুলনাসহ কয়েকটি স্থানে সংঘবদ্ধ মাদক কারবারী, জুয়ারিসহ চিহ্নিত অপরাধীরা রীতিমত বাধাহীনভাবে সাংবাদিকদের উপর হামলে পড়েছে। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সাংবাদিক কমিউনিটিসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন।
নড়াইলে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া পাঁচ আসামির ভিডিও করায় সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি সজীব রহমানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার বিকেলে নড়াইল জেলা জজ আদালতের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, ২০১৫ সালে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের কালাচাঁদপুর গ্রামে শিশু শাহীন হত্যাকাণ্ডে আজ পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এ ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে আদালত চত্বরে যান সাংবাদিক সজীব রহমান। বিকেল চারটার দিকে আদালত থেকে দণ্ড পাওয়া আসামি শিমুল মল্লিক ও তাঁর মা শামীমা বেগম এবং একই গ্রামের সৈয়দ লিটন, জাহিদুর রহমান ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরকে প্রিজন ভ্যানে তুলছিল পুলিশ। এ সময় ভিডিও করতে গেলে সাংবাদিক সজীবকে আসামি ও তাঁর স্বজনেরা প্রথমে গালাগাল করেন এবং হেলমেট হাতে এক স্বজন মারতে তেড়ে আসেন। পুলিশ হেফাজতে থাকা এক আসামি সজীবকে লাথি মারেন। পরে আসামির স্বজনেরা সজীবকে মারধর করেন।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। গতকাল বুধবার দুপুরে হামলার এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার সাংবাদিকেরা হলেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের যশোর জেলা প্রতিনিধি এ এইচ এম জিয়াউল হক ও ক্যামেরাপারসন মো. শরীফ খান। দুর্বৃত্তরা সাংবাদিকদের মারধর করে দুই ঘণ্টা আটকে রাখে বলে অভিযোগ। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁদের একজনকে উদ্ধার করে। দুর্বৃত্তরা সাংবাদিকদের ক্যামেরা ভাঙচুর ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পর আবার ফেরত দেয় বলেও অভিযোগ করা হয়।
দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি আবুল কাশেম এর উপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ ও অস্ত্রধারী, মাদক কারবারি, বহু মামলার আসামি ওসামাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবিতে কক্সবাজারে কর্মরত সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেছে। বুধবার (২০ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, হামলাকারীরা এলাকার চিহ্নিত অস্ত্রধারী ও ইয়াবা কারবারী। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তারা। সাংবাদিক আবুল কাশেমের উপর হামলার ঘটনায় সাংবাদিকরা ফুঁসে উঠেছে এবং এমন জঘন্য হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক সমাজ। দ্রুত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার না করলে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলেও জানান তারা।
প্রসংগত, টেকনাফে দৈনিক যুগান্তর এর ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি সাংবাদিক আবুল কাশেমের উপর ইয়াবা কারবারী ও অস্ত্রধারী চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা গুলি বর্ষণ ও হামলা করেছে। এতে সাংবাদিক আবুল কাশেমের বাম হাতে গুরুতর জখম প্রাপ্ত হয়। গত সোমবার (১৮ নভেম্বর) দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার ঝিমংখালী এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। উপজেলার ঝিমংখালী এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ হোছনের ছেলে বহু মামলার আসামি ওসামা প্রকাশ বর্মাইয়া ওসামা ও ইউনুস, আব্দুল্লাহসহ অজ্ঞাত ১০/১২ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালায়। হামলায় আহত সাংবাদিক আবুল কাশেম বলেন, তারা আমাকে কিছুদিন আগেথেকে পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে চেইন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। গুলির আওয়াজ শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে আসায় কোনোমতে প্রাণে রক্ষা পাই এবং ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে অস্ত্রধারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
ফরিদপুরে সংবাদের তথ্য সংগ্রহকালে হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। এছাড়া তাদের প্রায় দুই ঘণ্টা জিম্মি করে রাখে হামলাকারীরা। পরে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় জিম্মিদশা থেকে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহত দুই সাংবাদিকের মধ্যে রয়েছেন আজকের পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হাসান মাতুব্বর (শ্রাবণ) ও দৈনিক খবর বাংলাদেশ পত্রিকার ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি মো. তাওহীদুল ইসলাম (পাজবা)।
সোমবার ( ১৮ নভেম্বর) বিকেলে জেলার মধুখালী পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের মহিষাপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল ইসলাম পিকুল, মধুখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি মনিরুজ্জামান মুন্নু ও থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করা হয়। পরে তারা ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। জানা যায়, হামলাকারীদের মধ্যে রয়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দা ও ফরিদপুর চিনিকলের সিডিএ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, তার ভাই মাইক্রোবাস চালক রানা মোল্যা, ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শাহজাহান হোসেনসহ অজ্ঞাত ১০/১২ জন ব্যক্তিবর্গেরা।
ঝিনাইদহের মহেশপুরে গাজী টিভির সিনিয়র নিউজ রুম এডিটর কিরণ মোস্তফার উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। বুধবার সন্ধ্যায় মহেশপুর পৌরসভার মডেল মসজিদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানায়, ছুটিতে থাকা সাংবাদিক কিরণ মোস্তফা সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে মহেশপুর উপজেলা শহরে যাচ্ছিলেন।
পথে পৌরসভার মডেল মসজিদ এলাকায় পৌঁছালে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা মহেশপুর পৌরসভা এলাকার সন্ত্রাসী শামসুল গাজী, একই এলাকার আলমগীর, ইকরামুল খাঁ, তুহিন খাঁ, খালিদসহ ১০/১২ জন হামলা চালায়। হামলাকারীরা লোহার রড, হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে কিরণ মোস্তফাকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অভিযুক্ত শামসুল গাজী, আলমগীর, ইকরামুলসহ আরও কয়েকজন কিছুদিন আগে সংখ্যালঘু ও কিরণ মোস্তফার জমি দখল করে খেলার মাঠ বানানোর চেষ্টা করে।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা যুগান্তর পত্রিকার প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম ও ইত্তেফাকের প্রতিনিধি মহসিন মিয়াকে তাতি দলের পাতি নেতারা হামলা চালিয়েছে। ওই দুই সাংবাদিক বালুরচর এলাকায় সন্ধ্যার পর চা সেবনকালে মাদক সেবি জুয়ারি এবং এলাকার চিহ্নিত অপরাধীরা তাদের উপর হামলা চালিয়েছে।
প্রবীণ সাংবাদিক, দৈনিক আমার সংবাদের খুলনা ব্যুরো প্রধান একরামুল কবিরের ওপর হামলার প্রতিবাদে ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার দাবিতে খুলনায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২০ নভেম্বর) খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনে গণমাধ্যমকর্মী ও এলাকাবাসীর আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা প্রেস ক্লাবের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও কালের কণ্ঠের ব্যুরো প্রধান এইচ এম আলাউদ্দিনের সভাপতিত্বে মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার বেল্লাল হোসেন সজল।