বিশেষ প্রতিনিধি:
* মামলাগুলো ফাইলবন্দি
* অনেক মামলায় গোপন সমঝোতা
* বাকি মামলাগুলো নিষ্ক্রিয় করছে দাপুটে তদবিরবাজরা
* প্রতি মামলাতেই কোটি কোটি টাকার ধান্দা বাণিজ্য
জুলাই বিপ্লবে আন্দোলনকারী ছাত্র জনতা হত্যার প্রতিটি ঘটনা সমঝোতা করা হয়েছে, নয়তো পুলিশ ও তদবিরবাজরা সেসব ধামাচাপা দিয়ে কোটি কোটি টাকার ফায়দা হাসিল করছে।
আন্দোলনে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে আগস্টে যখন তড়িঘড়ি মামলা রুজু করা হয় তখনও শত শত আসামির নাম যুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়াসহ নানারকম স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে একদফা বাণিজ্য হয়েছে। মামলার বাদী, পুলিশ আর নেপথ্যের ক্রীড়নকরা শুরুতেই একেক মামলার বিপরীতে কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি করেছে।
এখন আবার সেই মামলাগুলো নিয়ে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের নেতা পরিচয়ে, সাংবাদিক কিংবা সমন্বয়ক পরিচয়ে আরেক দফা বাণিজ্য চলছে। ফলে ফ্যাসিবাদ হটানোর আন্দোলনে শহীদ ছাত্র জনতার কোনো হত্যাকান্ডের-ই বিচার যে হচ্ছে না- তা নিশ্চিত বলা যায়। স্বজন হারানো পরিজনদের জন্য সীমাহীন কষ্টদায়ক, হৃদয়বিদারক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনে শহীদ ছাত্র জনতার হত্যা মামলাগুলোতে অহেতুক আসামি বানিয়ে, নানারকম স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে কারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন তাদের নামধাম পরিচয় উঠে এসেছে একাধিক অনুসন্ধানে। সেসব ঘটনার ৬/৭ মাস পর এখন মামলাগুলো নিষ্ক্রিয় করাসহ প্রভাবশালী আসামিদের রক্ষায় কারা কারা তদবিরের ইজারা নিয়ে মাঠে নেমেছেন, জানা গেছে তাদের পরিচয়ও।
খোদ রাজধানীর ভাটারা, বাড্ডা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত ২০ টিরও বেশি হত্যা (ফ্যাসিবাদী চক্রের হামলায় নিহত) মামলা ইতিমধ্যেই নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, সেসব মামলার আসামিরাও প্রকাশ্যে ঘুরছে ফিরছে। মামলার বাদী সাক্ষীরা পর্যন্ত আসামিদের অবস্থান দেখিয়ে পুলিশ, ডিবি, র্যাব এমনকি যৌথ বাহিনীকে জানিয়েও কোনো সুফল পাচ্ছেন না। আইন শৃংখলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও তদবিবাজদের দোহাই দিয়ে মামলার সকল তৎপরতা ফাইলবন্দি করে ফেলে রাখছে। তদবিরবাজদের টাকা খেয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা মামলাগুলো নিষ্ক্রিয় রাখছেন – অথচ ইনিয়ে বিনিয়ে সব দায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপানো হচ্ছে।
তেমনি একটি মামলা ভাটারা থানার, মামলা নাম্বার ৩৩/০২। জুলাই আগস্টের গণহত্যার এই মামলা থেকে বাঁচতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করে চলছে মামলায় এজাহার ভুক্ত আসামী ও আওয়ামী লীগের দোসররা। পূর্বের তারিখ দিয়ে বিএনপি’র বিভিন্ন কমিটি তৈরি করে পুলিশের কাছে তুলে দিচ্ছেন সেই তালিকা। এমন তালিকা পেয়ে দ্বিধাদ্বন্দে খোদ পুলিশ সদস্যরাও। এমন এডিটিং করা ও ভূয়া কয়েকটি তালিকা এসেছে এই প্রতিবেদকের কাছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এসব তালিকার নেই কোনো ভিত্তি। কম্পিউটার দিয়ে এডিটিং করে নতুন ভাবে তৈরি করা হয়েছে এসব কমিটি।
সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হত্যা ও হামলার ঘটনায় রাজধানীর ভাটারা থানাসহ বেশ কয়েকটি থানায় মামলা রয়েছে শরীয়তপুরের জাজিরার সক্রিয় আওয়ামীলীগ নেতা শাহজুল চৌকিদারের বিরুদ্ধে। এই মামলায় বেশ কিছুদিন ধরে জেল হাজতে রয়েছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত এবং পদধারী নেতা ছিলেন।
শাহজুল চৌকিদারকে রাজধানীর ভাটারা থানার ৩৩-নং হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরে ওই তদন্তকারী কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে একটি ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক দলের কমিটিতে শাহজুল চৌকিদারের নাম রয়েছে বলে দাবি করেন। দাবি অনুযায়ী সেই কমিটির তালিকাও দেখান তিনি। তবে এই কাগজ কে দিয়েছে, বা কোথায় পেয়েছে জিজ্ঞেস করলে উত্তর না দিয়ে কল কেটে দেন তিনি। এরপর একাধিকবার মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
সরজমিন অনুসন্ধান করে জানা গেছে উপজেলার বিকে নগর ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক দলের ওই কমিটিতে নাম নেই শাহজুল চৌকিদারের।
তবে ২০২৩ সালের হুবহু একটি কমিটির তালিকা রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে। তাতে দেখা যায় তালিকার ৮-নং সহ-সভাপতি তালিকার সজিব তালুকদারের জায়গায় এডিটিং করে শাহজুল চৌকিদার বসানো হয়েছে। ওই কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোঃ শাহ আলম আকন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ ইউনুস মোল্লা, ও সদস্য সচিব মোঃ রফিকুল ইসলাম।
এদিকে শাহজুল চৌকিদারের নাম দেয়া কমিটি ভুয়া দাবি স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের। এডিটিংয়ের মাধ্যমে দলের নাম ব্যাবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিকে নগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারন সম্পাদক এবং এসকল ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ভাবে ব্যাবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন সেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর বিভাগ।
এ বিষয়টি নিয়ে ভাটারা থানার ওসি (তদন্ত) পরিদর্শক সুজন হকের সাথে এই প্রতিবেদক মুঠোফোনে কল করে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে মামলার বাদীকে নিয়ে থানায় যেতে বলেন। উল্লেখ্য এই সুজন হক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শরিয়তপুর জেলার জাজিরা থানার ওসি ( তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় ঐ এলাকার ফ্যাসিজমের সাথে যারা জড়িত তাদের সাথে সুসম্পর্ক থাকায় এই মামলার আসামীরা রেহাই পাচ্ছেন বলে এলাকার সাধারন জনগণ কানাঘুষা করছেন।
মামলার বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদক গুলাশান জোনের এডিসি মোঃ আল আমীনের সাথে কথা বললে তিনি জানান যারা ফ্যাসিজমের পক্ষে কাজ করছে এবং ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থান ব্যার্থ করার লক্ষ্যে নৃশংসতা চালিয়েছে তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সাধারণ জনগণ ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে সরকার তথা প্রশাসনের কাছে তারা জোর দাবী জানাচ্ছে যারা ফ্যাসিজমকে রক্ষা করার জন্য কাজ করছে এবং গণ অভ্যুত্থান দমনের জন্য নিষ্ঠুরতম নৃশংসতা চালিয়েছে তাদেরকে যেনো কোনভাবেই রেহাই দেওয়া না হয়।